Sunday, July 31, 2016

অনুপম দাশশর্মা

এখন বৃষ্টি

এখন অনেক বৃষ্টি, ধুয়ে গেছে কলঙ্কের সব দাগ
নিস্তেজ গ্রামবাসীরা সার বুঝেছে
হাত জোড় করলে হরিলুঠের বাতাসা পাওয়া যায়
ঠিকঠাক সব বোঝে যাঁরা
তাঁরাই অবোধ, উৎশৃঙ্খল

এখন তো দেয়াল বেয়ে নেমে আসে সংকীর্তনের দল
ওরা বায়ুপায়ী, যেমন যেমন হাওয়ার গতি
দূর্গতি ঢেকেঢুকে ত্যামন তারাও আলোমুখী

নীরব করে দিচ্ছে শিরদাঁড়ার অন্তঃস্থল

বাকী থাকে কবিতা
সভ্যমনের শেষ উপাসনাগৃহে দ্রুত নেমে আসছে
আদিপুরুষের দলবল

হাতে তাদের বশীকরণের চেনা শৃঙ্খল

শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

আয় বৃষ্টি ঝেঁপে

বর্ষা আসব আসব করেও আসছে না
জমাটবাঁধা মেঘ বুকে নিয়ে গোমড়ামুখো আকাশ
স্বতঃস্ফূর্ত বর্ষণ নেই, শুধু
মাঝে মাঝে চোখের জলের মত
গড়িয়ে পড়া দু-এক ফোঁটা মুক্তো।

বৃষ্টি আমায় মাতাল করে
মনে নেশা ধরায়, চোখে রঙ দেয়
অনেকদিন আগে দেখা সেই মেয়েটাকে মনে পড়ে
বৃষ্টি মেখে হাততালি দিয়ে উঠেছিল।
জলখেলা ভালবাসত মেয়েটা
সারা শরীরে জল ছড়িয়ে হেসে উঠত খিলখিল করে
তার সাথে বর্ষাস্নাত হয়েছি কতবার
হাতে হাত রেখে কতবার বলেছি -
আয় বৃষ্টি ঝেঁপে.......

বৃষ্টির প্রত্যেকটা ফোঁটা সে উপভোগ করত
তার অনুভূতিপ্রবণ সারা অঙ্গ দিয়ে,
এক একটা ফোঁটা এসে পড়ত
তার শরীরের এক এক অংশে
আর সে শিউরে শিউরে উঠতো, যেন
কোনো পুরুষের গোপন স্পর্শ,
যেন কেউ তৃষিত ঠোঁটে আদর করছে তাকে!
বর্ষা লাবণ্যময়ী হোতো তার বিভঙ্গে,
তার ব্রীড়াবনত তনুর সৌকর্যে
শ্রাবণ উন্মাদ হোতো বিপুল বর্ষণে
আমি দেখতাম, মাতাল হতাম, আর বলতাম -
আয় বৃষ্টি ঝেঁপে........

এমন দীন বর্ষণ ভাললাগে না আমার
উন্মত্ত বর্ষণ চাই এখন
বিরামহীন, অবিশ্রান্ত, শুধু ঝরবে আর ঝরবে
ধুয়ে দেবে সমস্ত মালিন্য, সমস্ত ক্লেদ,
মেয়েটা আবার হেসে উঠবে খিলখিল করে।

সেদিনের সে, এখন পরিপূর্ণ নারী
প্রস্তুত হয়েছে নতুন সাজে
নাচবে বলে, হাততালি দেবে বলে,
এখন কি তোর কৃপণ হওয়া মানায়!!

আয় না বৃষ্টি, ঝেঁপে.........

সতীশ বিশ্বাস

অচেনা

দাঁড়িয়ে আছি
সামনে কাউন্টার
কাঁচের উপর লম্বা লাইন
মাথার পর মাথা
নড়াচড়া করছে
আমিও ওদের একজন
কোনটা আমি!
অনেকক্ষণ খুজে শেষে পেলাম।
ওই তো মাঝামাঝি জায়গায়--
মাথাটা স্থির হয়ে আছে।
আমি একটু এগোলাম-মাথাটাও একটু এগোল।
আমি আর একটু এগোলাম,মাথাটাও 
কাউন্টারের কাছে এল।   
তারপরে মাথাটা কাউন্টারে এসে
জলের বিল দিয়ে চলে গেল।
আমি তখনও লাইনে দাঁড়িয়ে!


বচন নকরেক

ভ্রষ্ট স্বপ্নের সুড়ঙে

জ্বীনে ধরা কুমারীকে
ঘিরে জটলা
প্রলাপ বন্ধে
কবিরাজি তন্ত্র-মন্ত্র,
কার্পাস তুলোয় মাখানো
পাঠা ছাগলের রক্ত
মোরগের পালক,
লাউয়ের খোলস হতে মদ
ঢেলে খাচ্ছে পুরোহিত
তার সাঙ্গপাঙ্গরা-
ভ্রষ্ট স্বপ্নের সুড়ঙে
ঢোকে, ভুলে রেখে
আসি পানপাত্র
আমি না রাজা
না কোন সম্মানী ব্যক্তি
সমাজের
তবুও হঠাৎ
ছোরা হাতে
ছুটে আসে
জ্বীনে ধরা
কুমারীটি
উপোস থাকা শরীরে
কোন রকম ছুটে
গিয়ে বুড়ো বটগাছের
আড়ালে দাঁড়াই!
ততক্ষণে ভোর
হয়ে গেছে,
পাখিরা ডাকছে;
ঘুমের ভেতর
ঘেমে ওঠা আমাকে
কে যেন
জাগিয়ে দিলো!


রেজওয়ান তানিম

রৌদ্রদিনের রাগ


জানি দেখা হবে একদিন, দূরবর্তী নদীগান যেমন উদাস করে
বলে যায় আমাদের ঘাসপুতুলের সুর, নতুন আদর চুমু মেখে
ওম খুঁজবার আরেক ফাগুন উপাখ্যান! উঁচুতে উঠলে শহরের
শেষে দেখা যাবে- মেঘের মিনারে ওই, পাখি ঠোঁটে প্রেম ফোঁটে!

প্রিয়ন্তিকা, ভুলে গেছ রৌদ্রদিন, ঘাসের চাঁদরে শুয়ে আনমনে
ডুবিভাসি প্রেম, সোনালি সোহাগ নিয়ে মিশে যাওয়া মাতাল মন!

কাজল ও চোখে ফেনা জাগে, জানি বালু ও জলের সঙ্গম অনিঃশেষ
দূরে চলে গেলেই যায়না ছিঁড়ে, প্রেমভাষা আনকোরা বেদনার রাগ!

মতিন বৈরাগী

বিব্রতকর স্মৃতি

নিস্তব্ধ মাঠে হাত ধরে হাঁটে নাচে গায় মায়াবিনী 
যেন হাত ধরাধরি করে হাঁটে একালের প্রেতপুরীর কুহক-কুহকিনী
অলৌকিক সম্ভাষণ জাগে--
যেন নদীটিও মুগ্ধ সরল রেখার মতো বয়ে যায় অশোকের বনে নিরালায়
অলৌকিক হাওয়ায়  ধবল ওড়না ওড়ে কিউপিড ডানায়
যারা প্রতিদিন জ্যোত্সনাকে ধরবে বলে অলকের পুলকে
দেখে; হেঁটে আসে সুলতান নতুন সালতানাতে, হেরেমের কঙ্কবাঈ নাচে
খলখল হাসে মসৃন ঠোঁট কতকাল পড়ে আছে ছোঁয়নি পুরুষ
কেবল কোনো একদিন আসবে এই মন্ত্র দিয়ে যায় জাঁদরেল মাসি
তবু
লোকে বলে প্রেত আর প্রেতিনীরা কামের গন্ধে বাসনার চুলে
উড়ায় জোনাকি, তারা ভাল প্রেমিক ছিল এখন পোকা আগুনের তাপে জ্বলে
তারা দেখেনি কিছু, কিছুই তাদের হয় না আর দেখা
প্রেতের পায়ের ঘুঙুর - মায়া; এক কুহকিনীর উল্লাস
হুরপরী তুলতুলে অপ্সরী পাখাঅলা মোমগলা
ভ্রু যেন কামনার রঙধনু আঁকা
আপেল স্তন গলে পড়ে লগ্নহয়  চোখের সীমায়
কত কামনারাঙা রক্ত প্রহ্লাদ নাচে
তাদের ছড়ানো পা বাঁকানো শরীর এখনও নৃত্যকরে হুরিদের লোভে, তারা
মৃত সবুজ ঘাসে নৃত্যের রূপ বদলায়
একটা ফ্রিজ শটে দূরে ও কাছে দুরকম মনে হয়
এই নদীটির তীরে এই মাঠের কিনারে প্রতিদিন জোছনা ও আঁধার নামে
একটা সরল রেখা একা একা ভেদ করে
কারো কারো বুক স্মৃতি গলে কান্না হয়, তবু

স্বীকার করতে পারে না আর-

মিজান ভূইয়া

আমরা দু'জনে

ভালোবেসে
হয়ে গেলে নির্জন ঢেউ
তবু ব্যলকনির পৃথিবীতে
পাখি আসে,
মন কাঁদে পুরণো কবরের মতো
মাথার ভিতরে শব্দ হয়,
সেইসব চুলের গন্ধ
সেইসব বিকেল উড়ে যায় দিগন্তের
দিকে
আমি,
নিজের নিয়তিকে নিয়ে একা একা
জ্বলি
সূর্য ডুবে গেছে জীবনের
রাত্রিও ডুবে গেছে
আর তো হলো না দেখাদেখা তো
হলো না আর!
তবুও পৃথিবীর গাছেরা জানে
পাতায় পাতায় আছি

আমরা দু'জনে

আল্পনা মিত্র

অসতর্ক এক রবিবার

একটা রবিবার
তখন মন আমার গোধূলি
আকাশ মাঝে মাঝে ঝরাচ্ছে সিকি-আধুলি
ঠিক দূরে একটা আহত কাক.....

এয়ারগানের গুলিতে ঝাঁঝরা শরীর নিয়ে
কতগুল আয়ত গভীর দৃষ্টির আড়ালে
ধুতরার কাটা ভরা ঝোপে বসে নিরাপদে

এমন দারুণ  কথা কার কাছে বা বলি
আঙুলে উঠে আসছে এক প্রোজ্জ্বল কবিতা
যদি লিখি....!!
তবে অন্ধকার,আলোর কাছে থাকবে ঋণী

চারিদিকে ঝকঝকে নক্ষত্রের মত কতো ক্লাব
দুর্ভিক্ষ,মারী,বন্যায় আহত নয় কোনো পার্ক

কিন্তু বৃষ্টি নেই;
আষাঢ়ের চোখে বালি,তাই শুধুই চোখে তার জ্বালা
খরা শ্রাবণ আবার মনমরা,মাটি হয়ে গেল রবিবারটা
পরিবেশে কিন্তু দূষণ নেই!!

একটু অসতর্ক মুহূর্তে দেখে, রবিবারটা
সেইইই.....আহত কাকটা......!!
পড়ে আছে পুকুর-বসানো আংটির মত পার্কে
দেওয়ালের পোস্টারগুলি! রবিবারকে শাসাচ্ছে

জানিপ্রতি বিপ্লবীর পথের শেষে বৃষ্টি পড়ে
হঠাৎ! শ্রাবণ কার দিকে সুনিপুণ ভাবে তাক করে!
হয়তো! পাঁচিলের ওপাশে কেউ গড়াচ্ছে

হঠাৎ শুনি পাখিটার চিৎকার
তাকিয়ে দেখলাম......!!!!
সদ্য  গুলি বিদ্ধ এক শান্ত রবিবার
নদীর ভেতর  থেকে
বুদ্ধদের ভাষায় প্রতিবাদ লিখে পাঠাচ্ছে বারবার।